সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে শরীয়তপুরের বেসরকারি একটি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন মাটিকাটার শ্রমিক আলী আজম সরদার (৪০)। কিন্তু চিকিৎসক ভুল অস্ত্রোপচার করায় সম্প্রতি আজমের বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়েছে।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার চর স্বর্ণঘোষ গ্রামের বাসিন্দা আলী আজম সরদার ৮ জুলাই এক সড়ক দুর্ঘটনায় বাঁ পায়ে আঘাত পান। ওই দিন রাতেই শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা আকরাম এলাহী স্থানীয় হাওলাদার ক্লিনিকে তাঁর পায়ে অস্ত্রোপচার করেন। কিন্তু অবস্থার অবনতি হওয়ায় সম্প্রতি ঢাকার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে তাঁর পা কেটে ফেলা হয়। বর্তমানে তিনি শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ৮ জুলাই নছিমন দুর্ঘটনায় বাঁ পায়ে আঘাত পান আজম। পরে স্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। আঘাত গুরুতর হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তখন সদর হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও স্থানীয় ক্লিনিকের দালাল শমসের মিয়া আজমকে হাওলাদার ক্লিনিকে ভর্তি করান।
১৭ হাজার টাকা চুক্তিতে ওই রাতেই শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা আকরাম এলাহী তাঁর পায়ে অস্ত্রোপচার করেন। কিন্তু রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় পরদিন সকালে পুনরায় আজমকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকেরা তাঁকে ঢাকায় পাঠান। ওই দিন রাতে তাঁকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এরপর ১০ জুলাই তাঁকে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়। পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁর পা কেটে ফেলার পরামর্শ দেন। ওই রাতেই ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি ক্লিনিকে নিয়ে তাঁর পা কেটে ফেলা হয়।
শরীয়তপুরের হাওলাদার ক্লিনিকে প্রথম অস্ত্রোপচারের সময় আজমের পায়ের ধমনি ও শিরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চিকিৎসক সেগুলো প্রতিস্থাপন করতে পারেননি। এ কারণে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। ধীরে ধীরে অবস্থার অবনতি হয়। হাড় ও মাংসে পচন শুরু হয়। তাই দ্বিতীয়বার অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসক হাঁটুর ওপর থেকে তাঁর পা কেটে ফেলেন। ১৭ জুলাই তাঁকে আবার শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ নিয়ে গত সোমবার সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে একটি সালিস বৈঠক হয়। সেখানে রোগীকে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় আকরাম এলাহীকে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আলী আজম সরদার শয্যাশায়ী। পাশে দুই শিশুকে নিয়ে কাঁদছেন স্ত্রী আয়শা বেগম। আলী আজম সরদার বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। অল্প খরচে শরীয়তপুরে চিকিৎসা নিতে চেয়েছিলাম। ডাক্তার প্রতারণা করে ক্লিনিকে নিয়ে এভাবে আমার ক্ষতি করবেন বুঝতে পারি নাই। ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলাম।’
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা সুমন পোদ্দার বলেন, রোগীর পায়ের ধমনি ও শিরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় রক্তসঞ্চালন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে হাড় ও মাংসে পচন ধরেছে। এ জন্য পা কেটে ফেলতে হয়েছে। অভিজ্ঞ সার্জন ছাড়া শরীয়তপুরে এমন জটিল অস্ত্রোপচার করা উচিত হয়নি।
হাওলাদার ক্লিনিকের মালিক আলমগীর হাওলাদার বলেন, অপারেশন থিয়েটারের কারণে নয়; রোগীর সমস্যা হয়েছে চিকিৎসকের ভুলের কারণে।
আকরাম এলাহী বলেন, ‘এ রকম অনেক অপারেশন আমি করেছি। কখনো সমস্যা হয়নি। তার পরও কাজ করলে ভুলত্রুটি হতে পারে। কী কারণে রোগীর পা কেটে ফেলা হয়েছে, তা আমি জানি না। তবে স্থানীয় মানুষের চাপে রোগীকে দুই লাখ টাকা দিতে রাজি হয়েছি।’
শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন নীতিশ কান্তি দেবনাথ বলেন, ‘চিকিৎসা-প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তা আমার জানা নেই। বিষয়টি জানার পরে স্থানীয়দের সহায়তায় রোগীর পুনর্বাসনের জন্য চিকিৎসককে দুই লাখ টাকা দিতে বলা হয়েছে।’
সূত্র-প্রথম আলো
No comments:
Post a Comment